অতিথি প্রতিবেদক
অগাস্ট / ০৮ / ২০২২
সিলেটের জকিগঞ্জে সুরমা-কুশিয়ারার উৎস মুখ থেকে আশুগঞ্জের মেঘনা নদী পর্যন্ত ক্যাপিটাল ড্রেজিং এর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। ৫ বছর মেয়াদি এ প্রকল্পে এক সঙ্গে ১৮টি নদী খনন করা হবে। ৪ দশমিক ৩ মিটার গভীর ও ৯০ মিটার প্রস্থ করে খনন করা হবে সুরমা নদী। এতে ব্যয় হবে ১ হাজার ৬৭৫ কোটি টাকা।
প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা বিআইডব্লিউটিএর নির্বাহী প্রকৌশলী (পুর) আ স ম মাশরেকুল আরেফিন এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, প্রকল্পটি চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, সুরমা নদী, কুশিয়ারা নদী, কালনী নদী, যাদুকাটা নদী, রক্তি নদী, বৌলাই নদী, মনু নদী, পুরাংগী নদী, জুমনাল খাল নদী, খোয়াই নদী, সুতাং নদী, বেলেশ্বরি খাল নদী, তিতাস নদী, পাগলা নদী, বুড়ি নদী, মোগড়া নদী, কংশ নদী ও আপার মেঘনা নদী খননের লক্ষ্যে ২০২০ সালে বিআইডব্লিউটি’র বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীরা সরেজমিনে স্টাডি করে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) প্রস্তুত করেন। গেল বছর প্রকল্পটি পরিকল্পনা কমিশনে প্রেরণ করা হয়। পরিকল্পনা কমিশন প্রকল্পটি সংশোধন করে দিতে কিছু নোট দিয়ে বিআইডব্লিউটিএ-তে ফেরত পাঠায়। চলতি বছরের শুরুর দিকে সংশোধন করে পুনরায় প্রকল্পটি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়। প্রকল্পটি বর্তমানে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেকে) চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে বলে বিআইডব্লিউটিএ সূত্র জানিয়েছে।
বিআইডব্লিউটিএর বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীদের তত্ত্বাবধানে মোট ৫ বছরে দু’টি ধাপে প্রকল্পের বাস্তবায়ন করা হবে। প্রথম দুই বছর হবে ক্যাপিটাল ড্রেজিং। ১৮ টি নদীর যে সকল জায়গায় চর পড়েছে বা ভরাট হয়ে গেছে-প্রথম দুই বছরে সে সকল জায়গা খনন করে পুরোপুরি ক্লিয়ার (পরিষ্কার) করে দেয়া হবে। পরবর্তী তিন বছর হবে সংরক্ষণ। পরের ৩ বছরে যে সকল জায়গায় নতুন করে চর পড়বে সেগুলো আবারও খনন করা হবে। ৯০ মিটার প্রস্থ ও ৪ দশমিক ৩ মিটার বা ১৪ ফুট গভীর করে সুরমা ও কুশিয়ারা নদী খনন করা হবে। ১৮টি নদীর যেখানে বর্তমানে মালবাহী নৌকা চলাচল করতে পারে এখানে এতো গভীর করে খনন করা হবে না। সার্ভে অনুযায়ী যেখানে যে রকম খনন করা প্রয়োজন; সেখানে সে অনুযায়ী খনন করবে বিআইডব্লিউটিএ। এ সকল নদীর যে অংশে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ড্রেজিং করছে বা করেছে, ওই এলাকা বাদ দিয়েই পুরো নদী খনন করা হবে।
সিলেটের জকিগঞ্জের সুরমা নদী ও কুশিয়ারা নদীর উৎস মুখ থেকে খনন কাজ শুরু করে আশুগঞ্জের আপার মেঘনা নদী পর্যন্ত খনন কাজ করা হবে। বর্তমানে আশুগঞ্জে প্রতি বছর বাংলাদেশ-ভারতের প্রটোকল অনুযায়ী ৮ ফুট গভীর ও ৩০ মিটার চওড়া করে খনন কাজ করা হয়। ভারত সরকারের খরচে আশুগঞ্জে বর্তমানে খনন কাজ করা হচ্ছে। বিআইডব্লিউটিএর প্রকল্প অনুমোদন হলে ৩০ মিটারের স্থলে নদীর প্রস্থ ৭০ মিটার চওড়া করা হবে। কেবল নদী খননই নয় নদীতে মোট ৫৬ টি ঘাটও নির্মাণ করা হবে। ৮টি কার্গো ঘাট, ২৮টি লঞ্চ ঘাট ও ২০টি খেয়া ঘাট নির্মাণ করবে বিআইডব্লিউটিএ। এছাড়াও নির্মাণ করা হবে ১৫টি স্লুইস গেইট।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, নদী খননের ফলে হাওরাঞ্চলের নদ-নদীর নাব্যতা ফিরে আসবে। পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নতি হবে। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ভাটিতে নেমে যাবে। হাওরাঞ্চলের ইরি-বোরো ফসলকে আগাম বন্যা থেকে রক্ষার পাশাপাশি বন্যার পানিও বেশি দিন আটকে থাকবে না। পর্যটন বৃদ্ধি পাবে। মাছের প্রজনন অনেকগুণ বেশী বৃদ্ধি পাবে। নদীতে শুকনো মৌসুমে থাকবে পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি। এতে সেচ সুবিধা আরও সহজ হয়ে উঠবে। কম খরচে মালামাল পরিবহনে সুবিধা বাড়বে বলে জানা গেছে।
নদী খননে মাটির ব্যবহারের বিষয়ে সম্প্রতি একটি পরিপত্র জারি করেছে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়। নদী খনন কাজের সময় জেলা প্রশাসককে প্রধান করে একটি কমিটি থাকবে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), পরিবেশ অধিদপ্তর, মৎস্য অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কমিটিতে থাকবেন। এই কমিটি কাজ তদারকির পাশাপাশি খননের বালুর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন। নিয়ম অনুযায়ী সরকারি প্রতিষ্ঠান, স্কুল, কলেজ, মসজিদ, মাদরাসা, এলজিইডি, সড়ক ও জনপথ বিভাগের কোনো কাজ করলে আগে তাদেরকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে। সাধারণ লোকজন কেউ নিতে চাইলে কমিটির কাছে আবেদন করতে হবে। পরবর্তীতে যথাযথ মূল্য দিয়ে নিতে পারবেন। কেউ বাড়ি-ঘর নির্মাণের জন্যেও অকশন বা নিলামের মাধ্যমেও নিতে পারবেন বলে বিআইডব্লিউটিএ জানিয়েছে।
বিআইডব্লিউটিএর নির্বাহী প্রকৌশলী (পুর) আ স ম মাশরেকুল আরেফিন বলেন, সাধারণত দেশের অন্যান্য নদীগুলো বিআইডব্লিউটিএ যেভাবে খনন করছে;এই ১৮টি নদীও একইভাবে খনন করা হবে। খনন কাজের মানের ক্ষেত্রে বিআইডব্লিউটিএর কোনো ছাড় নেই। বিশেষজ্ঞরা সার্বক্ষণিক তদারকি করবেন।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, প্রকল্প যখন একনেক সভায় উত্থাপিত হয়; তখন তো আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা হয়। এ সভায় সবাই থাকেন। তখন তারা প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দেন। এমনও হতে পারে আমরা নদী খনন করব আর পাউবো নদীর তীর সংরক্ষণ করবে। তাদের স্টাডি এখনো চলমান রয়েছে। আর আমাদের স্টাডি দু’বছর আগে শেষ করে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। বিআইডব্লিউটিএর প্রকল্পটি বর্তমানে একনেকে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। একনেকে অনুমোদনের পর পরবর্তী ৫ বছরে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। প্রকল্পটি চূড়ান্ত অনুমোদনের বিষয়টি ইতিবাচকভাবে আলোচনায় এসেছে এবারকার ভয়াবহ বন্যার প্রেক্ষাপটে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সুরমা-কুশিয়ারা নদী অববাহিক বন্যার পানি নামতে বিলম্বিত হওয়ার অন্যতম কারণ নদী খনন না হওয়া। ক্যাপিটাল ড্রেজিং প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে বড় তিনটি নদী সুরমা-কুশিয়ারা-মেঘনা অববাহিকা এলাকার প্লাবণভূমির চিহ্নিত করা ও সুরক্ষার বিষয়টি দৃশ্যমান হবে।