আলতামাস পাশা
অগাস্ট / ০১ / ২০২২
প্রতি দিনই আসে কাকটি। পাশের বাড়ির ৫ তলার ফ্লাটটি আছে বহুদিন। ফ্লাটটির বারান্দার গ্রিলে কাকটি বসে এসে।মাঝে মাঝে কা কা করে ডাকে। নিলয় কাকটিকে তাড়া দেয়। কিন্তু সহজে উড়ে যায় না সে। বরং চুপচাপ বসে থাকে। বেশ কিছু দিন এভাবেই চলে যায়। আশ্চর্য ঘটনাটি ঘটে দিন পনেরো পড়ে। তারিখটা নভেম্বরের ১৭।
নিলয় তারিখটা মনে রেখেছে। বারান্দায় বসে লেপটপে কাজ করছিল নিলয়। সামনে কফির কাপ আর প্লেটে সেন্ডুইচের আধ খাওয়া অংশ। ঠিক সে সময়ই ঘটনাটি ঘটে। কাকটি স্পষ্ট বাংলায় বলে উঠে, সেন্ডুইচের আধ খাওয়া অংশটি আমাকে ছুঁড়ে দাও তো’। চমকে নিলয় এদিকসেদিক তাকায় কিন্তু কাউকে দেখতে পায় না। সামনের ফ্ল্যাটের বারান্দা থেকে কেউ কথা বললো না’কি! এসময় কাকটির দিকে চোখ যায়। এবার সে স্পষ্ট বাংলায় কাকটিকে বলতে শোনে সেন্ডুইচের খাওয়া অংশটি আমাকে ছুঁড়ে দাও তো’। নিজের দু’কানকে বিশ্বাস করতে পারে না নিলয়। ভীষণ ভয় আর অস্থির লাগে তার। সে জানে কাক কখনও পোষ মানে না। কথা বলা তো দূরের কথা।
নিলয়ের বিস্ময়ের ঘোর কাটতে না কাটতেই কাকটি আবার বলে উঠে, কী হলো দিচ্ছ না কেন? নিলয় ভাবে সেকি পাগল হয়ে যাচ্ছ? পৃথিবী জুড়ে করোনার আস্ফালনই এজন্য দায়ী। মানুষের চিন্তা শক্তি নষ্ট করে দেয়। নিলয়ের মনে হয় তার ছেলেবেলার কথা। গ্রামে কেটেছে তার শৈশর আর কৈশোর। গ্রামে থাকতে সে শীত-গ্রীষ্ম পাখির বাসা দেখে বেড়াতো। কত রকম পাখি। ডাহুক, বক, শালকি, ফিঙে, মাছরাঙা আরো কত! কাকের বাসায় নানান জিনিষ পাওয়া যেতো। তাই মাঝে মাঝেই কাকের বাসায় হানা দিতে ভালাে লাগতো নিলেয়ের। বিভিন্নি ধরনের চামচ, সাবান, এমনকি মাঝে মাঝে টাকাও পাওয়া যেতো। সে ভারী মজার ব্যাপার ছিল। কত রকম পাখি আছে যাঁরা কথা বলতে পারে, তবে তা শেখানো বুলি। কিন্তু কাকা তো সেসব পাখির পর্যায়ে পড়ে না। ত’হলে? এই কাক কথা বলা শিখলো কিভাবে? তাও নিজের চাহিদা বুঝে কথা বলছে।
শুধু তাই নয় আবার স্পষ্ট বাংলায়। সেন্দুইচের বাকী অংশ নিলয় কাকটির দিকে ছুঁড়ে দিতে যেতেই কাকটি আবারো বলে উঠে, ‘এভাবে ছুঁড়ে দিও না, তোমার প্লেটটা বারান্দার গ্রিলের নীচে রাখ আমি ওখান থেকেই খাবো। কাকটা উড়ে এসে বসে গ্রিলের ওপর। তারপর ঠোঁট দিয়ে সেন্ডুইচের বাকী অংশ একটু একটু করে ছিঁড়ে খায়। নিলয় বিস্ফোরিত চোখে চেয়ে চেয়ে দেখে। আসলেই কি নিলয়ের ভ্রান্ত প্রত্যক্ষণ হচ্ছে? এমনটি তো হবার কথা নয়। ল্যাপটপে সে স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে। কোথাও কোনো গন্ডগোল নেই। কেবল এই কাকটি- আচ্ছা, পৃথিবীর সব দেশেই তো কাক আছে। নিলয়ের বাসার বারান্দার গ্রিলে বসে সেন্ডুইচ খাচ্ছে যে কাকটি তার শরীরের কোথঠর কোনো ডিভাইস লাগানো নেই তো? এমন কি হতে পাওে যে, কাকটিকে কেউ আড়াল থেকে নির্দেশনা দিচ্ছে? কাক নিয়ে কোন পরীক্ষা বা গবেষণা চালাচ্ছে? এমনটি তো মাথায় আসেনি নিলয়ের। এভাবেই দিন সাতেক চলে যায়। কাক প্রতিদিন নিলয়ের বারান্দায় এসে খাবার খেতে চায়। ভালো মন্দ নিয়ে কথা বার্তাও বলে।
এই তো সেদিন বললো, ‘শোনো নিলয়, তোমাদের পৃথিবীর অবস্থা কিন্তু মোটেই ভালো নয়। নানা জায়গায় আমি উড়ে বেড়াই, আমার আতœীয়রাও বেড়াতে আসে অন্য দেশ থেকে। তবে কোথাও অবস্থা তেমন ভালো নয়। কি লেখ সারাদিন এতো ল্যাপটপে। তোমার অফিসে যেসব গবেষণা হয়, তার আসলে কোন মানেই হয় না। আমাদের... হঠাৎ চুপ করে যায় কাকটি। নিলয় তাকে জিজ্ঞেস করে ‘তোমাদের কি?’ কাকদের কি আলাদা একটা জগত আছে? কাকটি চুপ করে থাকে। তারপর একটু পরে উড়ে কোথায় যেনো চলে যায়। দুদিন তার দেখা মেলে না। পাখি বিষয়ক প-িত পক্ষীবিদ ড. সোবহানের কাছে বিষয়টি নিয়ে আলাপ করতে নিলয়কে পরামর্শ দেয় তার ঘনিষ্ট বন্ধু এমদাদুর। ড. সোবহান খুব ব্যস্ত মানুষ।
একে তো করোনার সময়, তায় ব্যস্তটা, তাই ঠিক হয় জুম মিটিং হবে ড. সোবহানের সাথে। ড. সোবহান বাংলাদেশের প্রখ্যাত একজন পক্ষীবিদ। দুর্লভ প্রজাতির বেশ কিছু পাখি এখনও বাংলাদেশের বনাঞ্চলে জীবিত আছে তা তিনি অনুসন্ধান করে প্রমাণ করেছেন। আর তাই আন্তর্জাতিকভাবেও তিনি খ্যাতি পেয়েছেন। বিভিন্ন নাম করা জার্নালে তার গবেষণা নিবন্ধও প্রকাশ পেয়েছে। নিলয় ভাবে এধরনের পক্ষীবিদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে কাক বা পাখিদেও সম্পর্কে তাকেও কিছুটা পড়ালেখা করে নিতে হবে। তাই পাখিদের উপর বেশ কিছু বই সে সংগ্রহ করেছে। আজ রাত থেকেই পড়া শুরু করবে ঠিক করে নিলয়। কত রকম পাখি আছে পৃথিবীতে ভাবতে অবাক লাগে নিলয়ের। এদের মধ্যে কিছু পাখি রয়েছে যারা মানুষের ভাষা অনুসরণ করতে পারে। অর্থাৎ নকলনবীশ এসব পাখি। সেদিক থেকে বললে তোতাপাখি বা টিয়া পাখি সবচেয়ে অগ্রগামি কথক পাখি।
উল্লেখ্য টিয়া পাখি হচ্ছে আফ্রিকান গ্রে, অ্যাকলিটাস টিয়া আর আমাজন টিয়া। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে পাখিদেও মস্তিষ্কের কাঠামো মানুষের মস্তিষ্কেও সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। মানুষের মস্তিষ্কেও দুটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এসব পাখিদেরও রয়েছে। যেমন, সেরিব্রিলাম এবং করটেক্স। করটেক্স নিয়ন্ত্রণ করে প্রত্যক্ষণ, সংবেদনশীল তথ্য আদান-প্রদান, স্মৃতি এবং ভাষাগত বিষয়। অন্যদিকে সেরিব্রিলাম নিয়ন্ত্রণ করে ঐচ্ছিক পেশি সঞ্চালনের কাজ। পাখিদেও মস্তিষ্কের এই দুটি অংশ একটির পর অন্যটির কাজ করে মানুষের কণ্ঠস্বর অনুসরণে সহায়তা করে। পাখিদের দাঁত নেই, ভোক্যাল কর্ড নেই। তারা শুধুমাত্র শোনা শব্দের অনুসরণ করে। অবশ্য ভোক্যাল কর্ডেও পরিবর্তে তাদেও রয়েছে সিনরিক্্র নামক পেশী ফোলানোর ক্ষমতা যা তাদের বুকের কাছাকাছি থাকে। এর মাঝে বিশেষ রস থাকে। এই পেশী স্ঞ্চালনে পাখিরা গান গায়। শব্দ উচ্চারণ করে।
মানুষের কথা পাখিদেরও বোঝার কথা নয়। তবে তারাই একমাত্র প্রাণী যারা মানুষদেও কথা অনেকটা হুবহু অনুকরণ করতে সক্ষম। নিলয় ভাবে কিন্তু এই কাকটি তো অনুকরণ করছে না। নিজের চিন্তপ্রসূত কথা বলছে! খাওয়ার শখের কথা জানাচ্ছে। নাহ্ আর পারছে না নিলয়। মাথাটা ঝিম ঝিম করছে। পাখিদের নিয়ে নিলয়ের পড়াশুনা এগিয়ে চলে। শীঘ্রই তার জুম মিটিং হবে পক্ষীবিদ ড. সোবহানের সঙ্গে।
পাখিদের সম্পর্কে অনেক কিছুই জানতো না নিলয়। যেমন পাখিরা হচ্ছে পৃথিবীর বড় আবহাওয়াবিদ। একথা আজ বিশ্বপয় প্রমাণিত সত্য যে, পাখি এবং প্রাণীরা যে কোন প্রাকৃতিক দুর্র্যোগের আগাম সংকেত পেয়ে যায় এবং নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছোটে সংকেত দিতে দিতে। কখনোবা ওড়ার ভঙ্গিমাতেই স্বজাতিরা এবং অন্য পাখিরা ব্যাপারটি বুঝে যায়। এমনকি পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের সময় বা দুপুরেই যদি ঘন কালো মেঘে আকাশ ছেয়ে যায়, সে ক্ষেত্রেও পাখিরা তা বুঝে ফেলে এবং নিরাপদ আশ্রয়ে ছোটে। পাখিদের কণ্ঠস্বর কিংবা উড়ে যাবার ভঙ্গিতে কি গ্রাম, কি প্রাকৃতিক বন, এমনকি আদিবাসী মানুষদেরও জানা হয়ে যায় কী ধরনের বিপদ কোন দিক থেকে আসছে।
পাখিদের সংকেতে হাজারো রকমের দিকনির্দেশনা থাকে। পাখিরা নদী-সাগরের ঘ্রাণ ও বাতাস শুকে জলোচ্ছ্বাস, ঝড়, ঘূর্ণিঝড় কিংবা টর্ণোডোর আভাস পেয়ে যায় আগেভাগেই। প্রকৃতি ওদের মগজে বা চোখের রাডারে ঠিকই বিপদ সংকেত পৌঁছে দেয়। প্রকৃতিরও একটি নিজস্ব রোজনামচা আছে। যা মানুষ জানে না বা জানার চেষ্টাও করে না, কিন্তু পাখি ও প্রাণীরা তা জানে ও বোঝে। পাখিসহ বিভিন্ন প্রাণী পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে চলে। মানুষ তা বুঝেও বুঝতে চায় না। প্রকৃতিকে অবহেলার ফল এখন মানুষ পাচ্ছে। প্রকৃতির ক্ষতি করলে তার ফল হাতে-নাতেই পেতে হয়।